বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ (তৃতীয় পর্ব)

যুগ

মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি সাহিত্যিকগণের অবদান উল্লেখযোগ্য। মূলত এরা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান রচনার জন্য বিখ্যাত। মুসলিম সাহিত্যিকদের রচিত সাহিত্যকে বলা হয়ে থাকে রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান। এখানে প্রথমবারের মতো মানবীয় বৈশিষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে।

শাহ মুহম্মদ সগীর : বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি শাহ মুহম্মদ সগীর যিনি ইউসুফ জোলেখা কাব্যের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। এই কাব্যের কাহিনী মিশরের প্রেক্ষাপটে রচিত। কোরআন এবং বাইবেল অনুবাদ করে তিনি এটি রচনা করেছিলেন। এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম প্রণয়োপাখ্যান এবং শাহ মুহম্মদ সগীর এই ধারার প্রথম কবি।

বাহরাম খান: তিনি হলেন বিখ্যাত লাইলী মজনু কাব্যের অনুবাদক। সূফিতত্ত্বের আদলে ১১৮৮ লাইলী মজনু প্রথম রচনা করেন ইরানের কবি নিজাম গঞ্জাভী। এরপর ১২৯৮ সালে ভারতের ফারসি কবি আমির খসরু উক্ত কাব্য রচনা করেন। একই আদলে ইরানের অপর কবি আব্দুর রহামান জামী “লাইলা ওয়া মজনুন” প্রেমকাব্য রচনা করেন। ধারনা করা হয় দৌলত উজির বাহরাম খান জামীর কাব্য অনুবাদ করেছিলেন।এটি অনুবাদ করার জন্য নেজাম শাহ শুর তাকে দৌলত উজির উপাধী দিয়েছিলেন। তার রচিত অপর কাব্যের নাম ইমাম বিজয় যা কারবালার বিষাদময় ঘটনা অবলম্বনে রচিত হয়েছিল।

মুহম্মদ কবীর : ১৫৪৫ সালে হিন্দি কবি মনঝন মধুমালত রচনা করেন। তিনি ছিলেন সূফী সাধক এবং তার পীর ছিলো শেখ মুহম্মদ গাওস। ষোল শতকের কবি মুহম্মদ কবীর ১৫৮৮ সালে প্রেমাখ্যান মধুমালতী কাব্য রচনা করেন।

আব্দুল হাকিম: মধ্যযুগের এই কবি নিজেকে বাঙালি বলতে পছন্দ করতেন। তার কাব্যেও দেশপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে। তার লেখা কাব্যের মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য : ইউসুফ -জোলেখা, লালমতি-সয়ফুলমুলুক, নূরনামা ইত্যাদি।
মধ্যযুগের অন্যতম আরও কাব্যগ্রন্থ : শাহনামা ( মৌলিক গ্রন্থ এবং এটি রচনা করেন ফেরদৌসি), আমির হামজা কাব্য রচনা করেন ফকীর গরীবুল্লাহ।

আরাকান রাজসভায় বাংলা সাহিত্য :
সপ্তদশ শতাব্দীতে আরাকানে সমৃদ্ধ সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিলো। এই অবদানের কথা আবিষ্কার করেন আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ। বাংলা সাহিত্যে এটি রোসাঙ্গ নামে পরিচিত। আরাকানের অধিবাসীরা মগ নামে পরিচিত।
অবদান :
আরাকান রাজসভায় প্রথম বাঙালি ও আদিকবি ছিলেন দৌলত কাজী। লৌকিক কাহিনীর প্রথম রচয়িতা হিসেবে তিনি পরিচিত।তার রচিত কাব্য হলো : সতীময়না ও লোরাচন্দ্রানী। এছাড়া অপ্প্র কবি মরদনের রচিত গ্রন্থ নসীরনামা।চন্দ্রাবতী নামে রচিত কাব্যগ্রন্থটির রচয়িতা হলেন কোরশী মাগন ঠাকুর। আরাকানের শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন আলাওল। মধ্যযুগের সবচেয়ে উল্ল্যেখযোগ্য মুসলমান কবি ছিলেন তিনি। কবির জন্মস্থান চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ মতান্তরে ফরিদপুর এর ফতেয়াবাদ নামক জায়গায়।আলাওলের রচিত কাব্যগুলো হলো : পদ্মাবতী (হিন্দি প্রেমাখ্যান),সয়ফুলমূলক বদিউজ্জামান,সপ্তপয়কর, তোহফা, সেকেন্দারনামা,কাসিমের লড়াই ইত্যাদি। সেকেন্দারনামা কাব্যের রচনার মূল প্রেক্ষাপট ছিলো পারস্য বিজয়। পদ্মাবতী আলাওলের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ। এটি মালিক মুহম্মদ জায়সীর পদুমাবত অবলম্বনে রচিত। এটি তিনি ১৬৮৮ সালে মাগন ঠাকুরের অনুরোধে রচনা করেন। এই কাব্যের নায়ক নায়িকা হলেন – রত্নসেন ও পদ্মাবতী।

4+

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *