বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ (প্রথম পর্ব)

সাহিত্য

মধ্যযুগের প্রাথমিক সীমা নির্দেশ করে হলো মুসলিম শাসনের সূচনা। দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দি বা মুসলিম শাসনকালে রচিত সাহিত্যকে বলা হয়ে থাকে মধ্যযুগীয় সাহিত্যকাল। মধ্যযুগের প্রথম দেড়শ  বছরকে বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ(১২০০-১৩৫০) বা তমসার যুগ বলা হয়ে থাকে কারণ এই সময়ে কোনো উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায়নি। এই যুগের সাহিত্য –
১) রামাই পন্ডিতের : শুন্যপূরাণ এবং নিরঞ্জনের উষ্মা।
২) হলায়ুধ মিশ্রের : ১) সেক শুভোদয়া
এছাড়া ও আছে ডাক ও খনার বচন( ডাক হলো জ্যোতিষবিদ্যা এবং খনার বচন কৃষি ও আবহাওয়ার ব্যাপার উল্ল্যেখ করে)।
@ অন্ধকার যুগের সৃষ্টি হয়েছে মূলত তুর্কি আক্রমনের কারণে। এইসময় বাংলায় সেন আমলের রাজত্ব চলছিলো।

মধ্যযুগের সাহিত্যসমূহ : 
১) শ্রীকৃষ্ণকীর্তন : 
এটি মধ্যযুগের আদি নিদর্শন এবং বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এর কবি ছিলেন কবি বড়ু চণ্ডীদাস ( প্রকৃত নাম অনন্ত)। ১৯০৯ সালে শ্রী বসন্তরঞ্জন বিদ্বদ্বল্লভ রায় পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাকুরা জেলার দেবেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় এর বাড়ি থেকে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আবিষ্কার করেন। পরে ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ছাপা হয়েছিলো। এর আসল নাম শ্রীকৃষ্ণসন্দর্ভ। 
এটি সর্বজনীন স্বীকৃত ও খাটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ। এর অন্যনাম রাধাকৃষ্ণের ধার্মালী। মোট ১৩ খন্ডে রচিত কাব্যগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের অন্যতম নিদর্শন। 
২) বৈষ্ঞবপদাবলী: 
এটি মূলত রাধাকৃষ্ণের প্রেম সংক্রান্ত ছোট কবিতা।এখানে ৫ টি রসের সন্ধান পাওয়া যায়।

বৈষ্ঞবপদাবলীর কবি ছিলেন ৪ জন – বিদ্যাপতি,চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞান দাস
বিদ্যাপতি(১৩৮০-১৪৬০) : আদি রচয়িতা এবং তিনি ছিলেন মিথিলার রাজসভাকবি। তিনিই একমাত্র অবাঙ্গালী কবি ছিলেন এবং ব্রুজবলি ভাষার পদ রচনা করেন। ব্রুজবলি ভাষা হলো বাংলা এবং মৈথিলি ভাষার মিশ্রণ যার স্রষ্টা মিথিলার কবি বিদ্যাপতি। তাকে অভিনব জয়দেব বলা হতো এবং তার উপাধি ছিলো “কবি কণ্ঠহার “
—- এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর
শুন্য মন্দির মোর। এই পদটির রচয়িতা তিনি।

চণ্ডীদাস : বাংলা ভাষায় বৈষ্ঞব পদাবলীর আদি কবি হলেন চণ্ডীদাস। বাংলা সাহিত্যে তিনজন চণ্ডীদাস ছিলেন : বড়ু চণ্ডীদাস, দ্বীজ চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস । এই পদাবলীর রচয়িতা ছিল্রন দ্বীজ চণ্ডীদাস। 
—— শুনহ মানুষ ভাই-
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। 
তার রচিত বিখ্যাত উক্তি / জনপ্রিয় পদ।

গোবিন্দদাস: সংস্কৃত পন্ডিত এবং অলংকার শাস্ত্রতে বিখ্যাত ছিলেন। গীতগোবিন্দ তার ব্রজবুলি ভাষায় রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ
*** আধুনিক কালে ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী নামে।

# মঙ্গলকাব্য: মঙ্গল শব্দের আভিধানিক মানে কল্যান। মূল উপজীব্য বিষয় – দেবদেবীর গুণকীর্তন। মঙ্গল কাব্যে মনসা ও চন্ডী দেবির প্রাধান্য বেশি। এর শাখা তিনটি : মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল অন্নদামঙ্গল কাব্য। মঙ্গলকাব্যের কবি : কানাহরিদত্ত,ভারতন্দ্রে, মানিক দত্ত। 
* মনসামঙ্গল কাব্য: মনসা দেবীর কাহিনী নিয়ে এই কাব্য রচিত। মনসার এক নাম পদ্মাবতী। এই কাব্যের আদি কবি কানা হরিদত্ত। এবং জনপ্রিয় কাব্য পদ্মপুরান যার লেখক বিজয়গুপ্ত। মনসামঙ্গল এর সুকন্ঠগায়ক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন দ্বীজ বংশীদাস এবং তার কন্যা চন্দ্রাবতী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি। 
* চাঁদ সওদাগর ছিলো মনসামঙ্গল কাব্যের অন্যতম চরিত্র এটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী চরিত্র সমগ্র কাব্যে মনসার প্রতি তার বিরোধ ও অনীহা ফুটে উঠেছে।
# চণ্ডীমঙ্গল : চন্ডী দেবীর পূজা প্রচারের কাহিনী অবলম্বনে এটি রচিত। এই কাব্যের প্রধান কবি হলেন – মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, তার উপাধি কবিকঙ্কন(জমিদার রঘুনাথ তাকে এই উপাধি দেন)। তিনি ছিলেন দু:খবাদী কবি। তার রচিত চরিত্রের মধ্যে ভাডু দত্ত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঠগ চরিত্র। 

@Nayeem

1+

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *